কুটিনাটির অন্যতম বহু নিষিদ্ধাচারের মধ্যে শ্রীমদ্ভাগবতে(১/১৭/৩৮)বিশেষ চারটি বিষয় বর্জনের নির্দেশ রয়েছে-অভ্যর্থিতস্তা তস্মৈ স্থানানি কলয়ে দদৌ। দ্যুতংপানং স্ত্রিয়ঃ সূনা যত্রাধর্মশ্চতুবির্ধঃ।
অর্থ্যৎ , কলির আবেদন শ্রবণ করে মহারাজ পরীক্ষিত তাকে যেখানে দ্যূত ক্রীড়া, আসব পান, অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ এবং পশু হত্যা হয়, সেই সেই স্থানে থাকবার অনুমতি দিলেন।
(১) দ্যূত-ক্রীড়া (দূত্যং) : অপ্রাণি বস্তুদ্বারা ক্রীড়া যে স্থানে হয়, তাই দ্যূতক্রীড়া স্থান । তাস, পাশা, সতরঞ্চ, দশপঁচিশ, লটারী-গৃহ, বাঘবন্দীরূপ যত প্রকার ক্রীড়া আছে, সে-সব স্থানকে দ্যূতক্রীড়া স্থান বলা যায়। নলরাজা, যুধিষ্ঠির, দুর্যোধন, শকুনি প্রভৃতি, রাজন্যবর্গের ইতিহাস আলোচনা করলে দেখা যাবে যে, দ্যূত-ক্রীড়া-স্থানে জুয়াচুরি,কপটতা প্রভৃতি উপায় দ্বারা অর্থলাভের জন্য বিষম কলহ ও সর্বনাশ হয়ে গেছে। এসব ক্রীড়ায় যারা রত হয়, তারা ভয়ঙ্কর আলস্য ও কলহপ্রিয়তা লাভ করে। তাদের দ্বারা কোন ধর্ম-কর্ম হতে পারে না। কলি যে দ্যূতক্রীড়া স্থানে বাস করে, এতে আর সন্দেহ কী? যিনি উত্তম, ধার্মিক বা ভক্ত হতে ইচ্ছা করেন, তিনি অবশ্যই দূ্যতক্রীড়া পরিত্যাগ করবেন।
(২) নেশা (পানং) : তন্ত্রে বলেছেন- পানপাতা, সুপারি, তামাক, গাঁজা, মদিরা ও সুরা- এসকল আসব ব্রতধ্বংসকারী । পান সেবনে সুদুর্জয় বিলাসেপ্সা বৃদ্ধি হয়। সুপারি দ্বারা চিত্ত-চাঞ্চল্য উদয় হয় । তামাক দ্বারামতিভ্রংশ, জাড্য বা অলস্য ও ভগবদ্বহির্মুখতা হয় । গাঁজা সেবনে বুদ্ধি নাশ হয়। অহিফেন বা আফিম , ধূমপান ও মদ্যপান অল্পকালের মধ্যে দ্বিপদগনকে চতুস্পদ-তুল্য করে ফেলে। এ উপাধিসকল বহিমূখ জীবের ভক্তি খর্ব কার জন্য দুর্বৃত্ত কলি সৃষ্টি করেছে । যিনি আধ্যাত্মিক উন্নতি কামনা করেন, তিনি অবশ্যই এ সকল নেশা বর্জন করবেন।
(৩) অবৈধ স্ত্রীসঙ্গ (স্ত্রীয়ঃ) : স্ত্রী শব্দে ধর্মপত্নী এবং অধর্মপত্নী উভয়কেই বুঝায়। ভগবদ্গীতায় (৭/১১) ভগবান বলেছেন, ধর্মাবিরুদ্ধো ভূতেষু কামোহস্মি -ধর্মের অবিরোধী কামরূপে আমি প্রাণীগনের মধ্যে বিরাজ করি। শ্রীল প্রভুপাদ বলেন, “যৌন জীবনের উদ্দেশ্য হচ্ছে ধর্মপরায়ণ সন্তান উৎপাদন করা । তা না করে যদি ইন্দ্রিয়তৃপ্তির জন্য যৌন জীবনযাপন করা হয়, তা অন্যায়।” সুতরাং , কেবল সন্তান জন্মদান ব্যাতীত বা অবিধিপূর্বক যে স্ত্রীসঙ্গ , তাও অবৈধ এবং এই প্রকার ইন্দ্রিয়-সুখভোগ পরায়ন ব্যক্তিদের বলা হয় গৃহমেধী। এছাড়া , এ বিষয়ক লেখা , ভিডিও , চিত্র ইত্যাদি দেখা, চিন্তা করা এবং কৃত্রিম উপায়ে যৌনসঙ্গ , স্ত্রীসঙ্গী, অভক্ত সঙ্গ-এসবই অবৈধ সঙ্গ । এই প্রকার সঙ্গ জীবের চেতনাকে কৃষ্ণভক্তি থেকে দূরে রাখে । তাই তা ভক্তির চরম প্রতিকূল এবং অবশ্য বর্জনীয়।
(৪) আমিষাহার (সূনা) : প্রায় সব খাবেরেই আমিষ আছে। তবু আমাদের সমাজে মাছ, মাংস, ডিম, পেঁয়াজ , রসুন, মসুর ডাল ইত্যাদি আমিষজাতীয় খাদ্য বলে গণ্য করা হয় । আর সূনা অর্থ প্রাণিবধ। মাংস খেতে হলে প্রাণীহত্যা করতে হয়, যা মহাপাপ। তাছাড়া, যেখানে বিকল্প অনেক খাদ্য পৃথিবীতে এখনো রয়েছে, সেখানে অযথা কেবল জিহ্বার লালসায় নিরীহ প্রাণীদের হত্যা করা কী প্রয়োজন? আহারের ওপর জীবের চেতনা অনেকাংশ নির্ভর করে। যেমন মাংসাশী প্রাণীরা সাধারনত হিংস্র এবং তৃণভোজীরা শান্ত প্রকৃতির হয়। যদি কেউ শিশুকাল থেকেই ধারালো অস্ত্র দ্বারা ছোট মাছ থেকে শূরু করে বড় বড় পশুদের হত্যা করতে দেখে, তবে একসময় মানুষ-হত্যাও তার পক্ষে স্বাভাবিক মনে হবে। তাছাড়া শারীরিক , সামাজিক এবং পরিবেশগত সবদিক থেকেই প্রাণিহত্যা ও মাংসাহার ক্ষতিকর । পারমার্থিক অগ্রগতির জন্য নিঃসন্দেহ শুদ্ধ, সাত্ত্বিক , নির্মল চেতনা প্রয়োজন। তাই প্রত্যেকের এসমস্ত রজো-তমোগুণসম্পন্ন খাবার বর্জন করা উচিত ।
তপস্যা, শৌচ, দয়া ও সত্য রূপ ধর্মের চারটি স্তম্ভ ( ভা ১/১৭/২৪) উক্ত চারটি পাপকর্ম দ্বারা নষ্ট হয়। এভাবে নেশার দ্বারা তপস্য , অবৈধ যৌনসঙ্গ দ্বারা শৌচ বা শুচিতা , মাংসাহারের দ্বারা দয়া এবং দ্যূতক্রীড়া দ্বারা সত্যতা নষ্ট হয়। তাই এসব পরিত্যজ্য।
স্মর্তব্যঃ সততং বিষ্ণুর্বিস্মর্তব্যো ন জাতুচিৎ । সর্বেবিধিনিষেধাঃ স্যুরেতয়োরেব কিঙ্করঃ।। - ‘সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ রাখা উচিত এবং কখনো তাঁকে ভুলে না যাওয়া উচিত নয়- সমস্ত বিধিনিষেধ এ দুটি মূল বিধিনিষেধের অনুগত।” (পদ্মপুরাণ) বৈকুন্ঠে ভক্তির সর্ম্পূন্ন অনূকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও জয়-বিজয়ের অপরাধ হয়েছিল । আবার , প্রহ্লাদ মহারাজ অসুরকূলেও হরিভক্তি অনুশীলন করেছিলেন । তাই মানসিক দূঢ়তা আবশ্যক , আর এ দূঢ়তা আসবে শুদ্ধভক্তের করুনায় এবং শুদ্ধ নামভজনের মাধ্যমে।
শরণাগতি গীতিতে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর লিখেছেন-
তপস্যা, শৌচ, দয়া ও সত্য রূপ ধর্মের চারটি স্তম্ভ ( ভা ১/১৭/২৪) উক্ত চারটি পাপকর্ম দ্বারা নষ্ট হয়। এভাবে নেশার দ্বারা তপস্য , অবৈধ যৌনসঙ্গ দ্বারা শৌচ বা শুচিতা , মাংসাহারের দ্বারা দয়া এবং দ্যূতক্রীড়া দ্বারা সত্যতা নষ্ট হয়। তাই এসব পরিত্যজ্য।
স্মর্তব্যঃ সততং বিষ্ণুর্বিস্মর্তব্যো ন জাতুচিৎ । সর্বেবিধিনিষেধাঃ স্যুরেতয়োরেব কিঙ্করঃ।। - ‘সর্বদা কৃষ্ণকে স্মরণ রাখা উচিত এবং কখনো তাঁকে ভুলে না যাওয়া উচিত নয়- সমস্ত বিধিনিষেধ এ দুটি মূল বিধিনিষেধের অনুগত।” (পদ্মপুরাণ) বৈকুন্ঠে ভক্তির সর্ম্পূন্ন অনূকূল পরিবেশ থাকা সত্ত্বেও জয়-বিজয়ের অপরাধ হয়েছিল । আবার , প্রহ্লাদ মহারাজ অসুরকূলেও হরিভক্তি অনুশীলন করেছিলেন । তাই মানসিক দূঢ়তা আবশ্যক , আর এ দূঢ়তা আসবে শুদ্ধভক্তের করুনায় এবং শুদ্ধ নামভজনের মাধ্যমে।
শরণাগতি গীতিতে শ্রীল ভক্তিবিনোদ ঠাকুর লিখেছেন-
ষড়ঙ্গ শরণাগতি হইবে যাঁহার । তাঁহার প্রার্থনা শুনে শ্রীনন্দকুমার।।
অত্যন্ত দুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম দানের জন্যই শ্রীচৈতন্য মহাপ্রভু জবীকে শরণাগতির শিক্ষা দিয়েছেন। তাই এখানে সেই সুদুর্লভ কৃষ্ণপ্রেম লাভের প্রার্থনার কথাই বলা হয়েছে। খাদ্য গ্রহনে যেমন উদর পূর্তি হয়, তেমনি দৈন্য, আত্মনিবেদন, গোপ্তৃৃত্বে বরণ, কৃষ্ণ আমাকে অবশ্যই রক্ষা করবেন- এরূপ বিশ্বাস, ভক্তি-অনুকূল বিষয় গ্রহণ এবং ভক্তি প্রতিকূল বিষয় বর্জন- এ ছয় প্রকার শরণাগতি যে মাত্রায় জীবের মধ্যে বর্তমান থাকবে , সে মাত্রায় জীব শ্রীকৃষ্ণের করুণা তথা কৃষ্ণপ্রেম লাভ করবে।


মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন