আমি কিভাবে কৃষ্ণভাবনাময় হলাম তার কিছু পটভূমি আর আমার জীবনের অতীত ঘটনার ওপর আলোকপাত করা যাক। আমি যুক্তরাষ্ট্রের উইসকনসিন প্রদেশের মিলওয়াকি শহরে বেড়ে উঠি। আমার মাতামহ ছিলেন পরম ধার্মিক এবং তিনি খুবই অনাড়ম্বর জীবন যাপন করতেন। আমি প্রায়শ তার কাছে বেড়াতে যেতাম। একবার আমার হাতে অনেক আচিল হয়েছিল। অনেক চিকিৎসা করার পরও সেটা ভালো হচ্ছিল না। তখন আমার মাতামহ একটা গিটসহ ঘাস নিয়ে আসতে বললেন এবং তার কথামতো ওই ঘাস প্রত্যেক আচিলের উপর ছুঁইয়ে বললাম, ঈশ্বরের নামে বলছি তোমরা দূর হয়ে যাও, দূর হয়ে যাও এবং আশ্চর্যজনকভাবে আচিল দূর হয়ে গেল। এরকম একটি তুচ্ছ কাজ ঈশ্বরের নামে করার জন্য যদিও মনে মনে নিজেকে দোষী মনে হচ্ছিল, তবে এই ঘটনা আমার ভেতরে এই বিশ্বাসের জন্ম দিয়েছিল যে, ঈশ্বরের নামে সর্বশক্তি আছে। আমার পিতা ছিলেন প্রপিতামহের ১৩ সন্তানের মধ্যে কনিষ্ঠ। আমার পিতামহ বড় ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি লক্ষ লক্ষ অর্থের মালিক ছিলেন। তিনি তার রঙের ব্যবসা অন্য এক কোম্পানির কাছে বিক্রয় করে সেই অর্থ তার সন্তানদের মধ্যে ভাগ করে দেন। আমরা পিউওয়াকি লেকের পাড়ে বিশাল বাড়িতে বাস করতাম। সেই লেকের পাড়েই আমি বড় হয়ে উঠি। এখানে পিউওয়াকিতে একটি নামহট্ট আছে। আমি সেখানে ৫-৯ বছর পর্যন্ত ছিলাম। আমার পিতা ধর্মযাজক হতে চেয়েছিলেন, কিন্তু ২য় বিশ্বযুদ্ধের শুরু হওয়ায় তিনি চিকিৎসা সহকারী হিসেবে যুদ্ধে যোগ দেন। সেই সময় ওই কিশোর বয়সে আমি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছিলাম বলে বাড়ি থেকে আমাকে মিলিটারি একাডেমিতে ভর্তি করিয়ে দেওয়া হয়।
মিলিটারি একাডেমির দিনগুলি আমি পড়াশুনাতে ভালোই ছিলাম আর সেই সাথে ফুটবল, গলফ, ট্রাকিং, ফেন্সিং, রাইফেল ক্লাবের মতো অনেক পাঠ্যকর্ম বহির্ভূত কাজ করতাম। আমি রাইফেল টিমের অধিনায়ক ছিলাম। ১২ কি ১৩ বছর বয়সেই আমি NRA -এর সদস্য হয়েছিলাম। মিলিটারি একাডেমিতে আমি সহকারি যাজক হিসেবেও কাজ করতাম এবং পবিত্র দ্রব্যাদি বহন করতাম যা উপাসনার পর সবাইকে প্রদান করা হতো। একদিন আমি দেখলাম প্রধান যাজক মদ্যপান করে মাতাল হয়ে পড়ে আছে। তখন আমি উপলব্ধি করেছিলাম যে, এই যাজক আমার গুরু হতে পারেন না। আমি পাঁচটি বৃত্তি লাভ করি, যার মধ্যে একটি ছিল নৌবাহিনীর কর্মকর্তা হিসেবে পড়ার সুযোগ। আমি তখন নৌবাহিনী প্রশিক্ষণ ক্যাম্পে যাবার জন্য আবেদন করলাম। তারা বলল যে, আমার নাকে কিছু সমস্যা আছে তাই আমি মেরিন অফিসার হতে পারব না, কিন্তু রিজার্ভ অফিসারের জন্য আমি ঠিক আছি।
ভগবান বুদ্ধের দর্শনের প্রভাব
এরপর আমি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে একবার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বিখ্যাত অধ্যাপক আসেন। তিনি ভগবান বুদ্ধ সম্পর্কে একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা করেন। তার সেই বক্তৃতা থেকে জানতে পেরেছিলাম যে, কিভাবে ভগবান বুদ্ধ জরা, ব্যাধি, আর সদ্যোজাত শিশু দেখে সমস্ত জাগতিক বিষয় ত্যাগ করে গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। তার সেই বক্তৃতা থেকে থেকে আমার মনে জেগে উঠছিল। যেন কিছু একটা আমাকে ডেকে চলছিল। আমি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। তাই পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে থাকে। সেজন্য আমি মিলওয়াকি উইস্কনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হই। Wisconsin আমেরিকার এমন একটি প্রদেশ, যেটির নামের ভেতর iscon (ইস্কন) আছে।
যোগ এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা
এ সময় আমি যোগ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি বইয়ের দোকানে গিয়ে আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে লেখা বই চাইলাম। দোকানিরা বলল ভারত থেকে প্রকাশিত একটি বই আছে, ভারত থেকে প্রকাশিত ওই বই আছে। আমি বললাম, আমি একজন আমেরিকান তোমাদের কাছে আধ্যাত্মিকতার উপর আমেরিকান কোনো বই নেই ? দোকানি বলল আমেরিকা ? হ্যাঁ, এ বইটা আমেরিকান লেখকের লেখা বই। বইটা ছিল এস্ট্রো প্রজেকশন (দেহের সীমাকে অতিক্রম করে অতিন্দ্রিয় অনুভুতির বিদ্যা) এর ওপর লেখা বই। কিভাবে প্রাণায়াম করতে হয়, কিভাবে দেহের সীমানাকে অতিক্রম করতে হয় তা লেখা ছিল বইটিতে। এরপর আমি বইটির লেখকের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমার তখন অভ্যাস ছিল কোন বই পড়ে আগ্রহী হলে সেই বইয়ের লেখকের সাথে দেখা করা। তো সানফ্রান্সিস্কোতে যখন আমি লেখকের বাসায় পৌছে দেখলাম দরজায় সাড়া দিয়ে কাউকে পাওয়া যাচ্ছেনা। বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখলাম তিনি মাছ রান্না করছেন। আমি তাকে বললাম, আমি আপনার বইটা পড়েছি এবং আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই বইটা নিয়ে। তিনি তখন আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং বললেন দেখ গত দুই বছর হলো আমি এটা করছিনা। আমি যখন আবার এস্ট্রো প্রজেক্ট করব, তখন তোমাকে জানাব। বুঝলাম একে দিয়েও হবেনা। আমি আবার বইয়ের দোকানে গেলাম এবং তিব্বতীয় বৌদ্ধবাদের সম্পর্কে বই কিনে নিয়ে এলাম। পড়ে বুঝলাম, এই বইগুলো যৌক্তিক কিন্তু আধ্যাত্মিক না। এরপর আমি রহস্যবাদী ইহুদী ধর্মের বই কিনলাম। আমি সলোমনের রহস্যবাদী আচারগুলো অভ্যাস করছিলাম।
হরেকৃষ্ণ সংযোগ শ্রীল প্রভুপাদের নিকট সমর্পণ
এর মধ্যে একদিন আমি একদল যুবক যুবতী দেখি রাস্তায় পত্রিকা বিতরণ করে বেড়াচ্ছে। আমি কাগজ নিলাম। তাতে লেখা আছে ‘কৃষ্ণ’সর্বাকর্ষক; ‘রাম’সমস্ত সুখের উৎস এবং ‘হরে’ আধ্যাত্মিক শক্তিকে আহ্বান। আমি সেই কাগজে তাদের ঠিকানা খুঁজলাম কিন্তু সেখানে কোনো ঠিকানা লেখা ছিল না। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি ভারতে যাব। সেখানে হয়তো আমি আমার গুরুর সন্ধান পেতে পারি। তারপর একদিন আমি গোল্ডেন গেটে দাঁড়িয়ে আছি। দেখি একদল মানুষ সেদিনকার যুবক যুবতীদের মতো পোশাক পরে গান গাইছে। তাদের কয়েক জনের মাথা নেড়া করা ছিল। তাই আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা ? আমাকে বলা হলো তারা প্রতি সপ্তাহান্তে এখানে আসে। গান গায়, নাচে। তারা খুব ভালো, কিন্তু কেউ তাদের ঠিকানা জানেনা। কয়েকদিন পর আমি দেখলাম গাছের গায়ে একটা পোস্টার টাঙানো আছে। সেখানে লেখা আছে রথ উৎসব। দুই সপ্তাহের মধ্যে একটা বিশাল রথ উৎসবের আয়োজন করা হবে।
নিচে লেখা আছে ২৫ সেন্ট দান করে নিরামিষ আহার পাওয়া যাবে। আমি ভাবলাম বেশ ভালো তো। আমি খুঁজে খুঁজে তাদের মন্দিরে হাজির হলাম। দেখলাম সবাই রান্নাঘরে, খাচ্ছে। আমি বসে পড়লাম। আমি চারদিকে তাকালাম এবং দেখলাম সবাই কথা বলছে আর খাওয়া দাওয়া করছে। বুঝলাম এখানে নিজে থেকে নিয়ে টিকে থাকতে হবে। তাই আমি নিজেই প্লেট নিয়ে খাবার তোলা শুরু করলাম। এরপর যখন আমি আমার ২৫ সেন্ট দান করতে গেলাম তখন, আমাকে বলা হলো পাশের ঘরে গিয়ে দিতে। সেখানে গর্গ মুনি আছেন। তিনি আমার টাকা নিবেন। তারপর আমি মন্দিরে একাকী বসে কৃষ্ণের ছবি দেখতে লাগলাম। সেই ছবিটা যেখানে ভগবান ব্রজবাসী পরিবেষ্টিত হয়ে একটা পাথরের উপর বসে আছেন আর তার দীর্ঘাঙ্গ নীলাভ পদযুগল যমুনা নদী ছুঁয়ে আছে।
হঠাৎ আমার মনে হলো এ জায়গার খোঁজই এতদিন ধরে করে বেড়াচ্ছি। তারপর আমি পাশের ঘরে গেলাম গর্গমুনির কাছে আমার ২৫ সেন্ট দিয়ে আসতে। টাকা নেওয়ার সময় গর্গমুনি আমার কাছে এক সেট ভাগবত বিক্রয় করলেন। তখনকার সময় একসেট ভাগবতে মাত্র তিনটি বই ছিল। যখন তিনি দেখলেন যে আমি আমার কাছে থাকা সব টাকা তাকে দিয়ে দিচ্ছি, তখন তিনি আমাকে পিছনে থাকা জয়ানন্দের দিকে তাকাতে বললেন। জয়ানন্দ প্রথমেই আমাকে যে কথা বললেন তা হল, “তুমি কি পেরেক গাঁথতে পার?” আমি বললাম, “অবশ্যই”। তারপর তিনি আমাকে একটা পেরেক দিয়ে বললেন, “দেখাও তো গেঁথে”। আমি পেরেকটা নিলাম আর দেয়ালে গাঁথলাম হাতুড়ি দিয়ে। তিনি তাই দেখে বললেন, “বেশ ভালো”। এরপর তিনি আমাকে একটা রথের ছবি দেখালেন। তিনি বললেন আমরা এরকম একটি রথ তৈরি করতে চাই। তখন আমি বললাম সামনের বছর নাকি ? তিনি বললেন,“না না দুই সপ্তাহের মধ্যে। এটা খুবই জরুরী। তুমি কি আমাদের সাহায্য করতে পারবে ?”
তখন থেকে প্রতিদিন আমি তাকে কাজে সাহায্য করতে যেতাম। তিনি আমাকে প্রভুপাদের কথা বলতেন। তিনি বলতেন প্রভুপাদ হচ্ছেন একজন মহৎ সন্ন্যাসী যিনি পাশ্চাত্যে হরিনাম সংকীর্তন এনেছেন। তারপর আমি তার অনুমতি নিয়ে একদিন জপ করতে গেলাম। নন্দকুমার আমাকে একসেট জপমালা দিয়েছিল। আমি পূর্বে যোগ অভ্যাস করতাম, তাই সেই জপমালা নিয়ে আমি অর্ধ-পদ্মাসনে বসে জপ করতে লাগলাম। আমার এর আগে এরকম অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। আমার রোমাবলী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। প্রথমদিন আমি কয়েক ঘণ্টা ধরে ৩২মালা জপ করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। আমি যখন ফিরে যাই তখন নন্দকুমার উদগ্রীব হয়ে বলে, “তোমার কাছে কি জপমালাটা আছে ? ওটা প্রভুপাদের জপমালা। এটা ভুল করে তোমাকে দিয়েছিলাম- আমি বললাম, “হ্যাঁ, ওটা আমার কাছে আছে।” নন্দকুমার তখন ওই জপমালাটা ফেরত দিয়ে অন্য একটি জপমালা দিয়েছিল।
আমি এরপর ভাবলাম যদি আমাকে চেষ্টা করতে হয় তাহলে আমি পুরোপুরি চেষ্টা করব। আর এটা যদি সত্য না হয়, আমি অন্তত বলতে পারব যে আমি চেষ্টা করেছিলাম। আর যদি এটি সত্য হয় তাহলে আমি অবশ্যই এটি লাভ করব। তাই রথযাত্রার দিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি মস্তক মুণ্ডণ করব। জয়ানন্দ প্রভু কৃপা করে আমাকে মুণ্ডণ করে দিলেন। আমার অনেক বড় শিখা ছিল। রথযাত্রার সময় আমি মুণ্ডিত মস্তকে প্রথাগত থান কাপড় পরিধান করলাম তখনকার সময় এত কড়াকড়ি ছিল না। ছয় মাস ধরে মন্দিরে যাতায়াত করা কয়েকজন দেখল কিভাবে মাত্র দুই সপ্তাহে আমি মস্তক মুণ্ডণ করে রথ টানছি। তখন তারা বলতে লাগলো যদি সে এটা করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারবো না ? মধুদ্বিষ এবং আরো অনেকে এরপর মন্দিরে যোগ দেয়। এভাবেই আমি নিজেকে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করি।
ভগবান বুদ্ধের দর্শনের প্রভাব
এরপর আমি ব্রাউন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই। সেখানে একবার হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এক বিখ্যাত অধ্যাপক আসেন। তিনি ভগবান বুদ্ধ সম্পর্কে একটি জ্ঞানগর্ভ বক্তৃতা করেন। তার সেই বক্তৃতা থেকে জানতে পেরেছিলাম যে, কিভাবে ভগবান বুদ্ধ জরা, ব্যাধি, আর সদ্যোজাত শিশু দেখে সমস্ত জাগতিক বিষয় ত্যাগ করে গৃহত্যাগী হয়েছিলেন। তার সেই বক্তৃতা থেকে থেকে আমার মনে জেগে উঠছিল। যেন কিছু একটা আমাকে ডেকে চলছিল। আমি পড়াশোনায় মনোনিবেশ করতে পারছিলাম না। তাই পরীক্ষার ফলাফল খারাপ হতে থাকে। সেজন্য আমি মিলওয়াকি উইস্কনসিন বিশ্ববিদ্যালয়ে স্থানান্তরিত হই। Wisconsin আমেরিকার এমন একটি প্রদেশ, যেটির নামের ভেতর iscon (ইস্কন) আছে।
যোগ এবং আধ্যাত্মিক জিজ্ঞাসা
এ সময় আমি যোগ বিষয়ে আগ্রহী হয়ে উঠি। আমি বইয়ের দোকানে গিয়ে আধ্যাত্মিক জীবন নিয়ে লেখা বই চাইলাম। দোকানিরা বলল ভারত থেকে প্রকাশিত একটি বই আছে, ভারত থেকে প্রকাশিত ওই বই আছে। আমি বললাম, আমি একজন আমেরিকান তোমাদের কাছে আধ্যাত্মিকতার উপর আমেরিকান কোনো বই নেই ? দোকানি বলল আমেরিকা ? হ্যাঁ, এ বইটা আমেরিকান লেখকের লেখা বই। বইটা ছিল এস্ট্রো প্রজেকশন (দেহের সীমাকে অতিক্রম করে অতিন্দ্রিয় অনুভুতির বিদ্যা) এর ওপর লেখা বই। কিভাবে প্রাণায়াম করতে হয়, কিভাবে দেহের সীমানাকে অতিক্রম করতে হয় তা লেখা ছিল বইটিতে। এরপর আমি বইটির লেখকের সাথে সাক্ষাৎ করতে গেলাম। আমার তখন অভ্যাস ছিল কোন বই পড়ে আগ্রহী হলে সেই বইয়ের লেখকের সাথে দেখা করা। তো সানফ্রান্সিস্কোতে যখন আমি লেখকের বাসায় পৌছে দেখলাম দরজায় সাড়া দিয়ে কাউকে পাওয়া যাচ্ছেনা। বাড়ির পেছনে গিয়ে দেখলাম তিনি মাছ রান্না করছেন। আমি তাকে বললাম, আমি আপনার বইটা পড়েছি এবং আমি আপনার সাথে কথা বলতে চাই বইটা নিয়ে। তিনি তখন আমাকে ভেতরে নিয়ে গেলেন এবং বললেন দেখ গত দুই বছর হলো আমি এটা করছিনা। আমি যখন আবার এস্ট্রো প্রজেক্ট করব, তখন তোমাকে জানাব। বুঝলাম একে দিয়েও হবেনা। আমি আবার বইয়ের দোকানে গেলাম এবং তিব্বতীয় বৌদ্ধবাদের সম্পর্কে বই কিনে নিয়ে এলাম। পড়ে বুঝলাম, এই বইগুলো যৌক্তিক কিন্তু আধ্যাত্মিক না। এরপর আমি রহস্যবাদী ইহুদী ধর্মের বই কিনলাম। আমি সলোমনের রহস্যবাদী আচারগুলো অভ্যাস করছিলাম।
হরেকৃষ্ণ সংযোগ শ্রীল প্রভুপাদের নিকট সমর্পণ
এর মধ্যে একদিন আমি একদল যুবক যুবতী দেখি রাস্তায় পত্রিকা বিতরণ করে বেড়াচ্ছে। আমি কাগজ নিলাম। তাতে লেখা আছে ‘কৃষ্ণ’সর্বাকর্ষক; ‘রাম’সমস্ত সুখের উৎস এবং ‘হরে’ আধ্যাত্মিক শক্তিকে আহ্বান। আমি সেই কাগজে তাদের ঠিকানা খুঁজলাম কিন্তু সেখানে কোনো ঠিকানা লেখা ছিল না। আমি তখন সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি ভারতে যাব। সেখানে হয়তো আমি আমার গুরুর সন্ধান পেতে পারি। তারপর একদিন আমি গোল্ডেন গেটে দাঁড়িয়ে আছি। দেখি একদল মানুষ সেদিনকার যুবক যুবতীদের মতো পোশাক পরে গান গাইছে। তাদের কয়েক জনের মাথা নেড়া করা ছিল। তাই আমি সেদিকে এগিয়ে গেলাম। আমি জিজ্ঞেস করলাম এরা কারা ? আমাকে বলা হলো তারা প্রতি সপ্তাহান্তে এখানে আসে। গান গায়, নাচে। তারা খুব ভালো, কিন্তু কেউ তাদের ঠিকানা জানেনা। কয়েকদিন পর আমি দেখলাম গাছের গায়ে একটা পোস্টার টাঙানো আছে। সেখানে লেখা আছে রথ উৎসব। দুই সপ্তাহের মধ্যে একটা বিশাল রথ উৎসবের আয়োজন করা হবে।
নিচে লেখা আছে ২৫ সেন্ট দান করে নিরামিষ আহার পাওয়া যাবে। আমি ভাবলাম বেশ ভালো তো। আমি খুঁজে খুঁজে তাদের মন্দিরে হাজির হলাম। দেখলাম সবাই রান্নাঘরে, খাচ্ছে। আমি বসে পড়লাম। আমি চারদিকে তাকালাম এবং দেখলাম সবাই কথা বলছে আর খাওয়া দাওয়া করছে। বুঝলাম এখানে নিজে থেকে নিয়ে টিকে থাকতে হবে। তাই আমি নিজেই প্লেট নিয়ে খাবার তোলা শুরু করলাম। এরপর যখন আমি আমার ২৫ সেন্ট দান করতে গেলাম তখন, আমাকে বলা হলো পাশের ঘরে গিয়ে দিতে। সেখানে গর্গ মুনি আছেন। তিনি আমার টাকা নিবেন। তারপর আমি মন্দিরে একাকী বসে কৃষ্ণের ছবি দেখতে লাগলাম। সেই ছবিটা যেখানে ভগবান ব্রজবাসী পরিবেষ্টিত হয়ে একটা পাথরের উপর বসে আছেন আর তার দীর্ঘাঙ্গ নীলাভ পদযুগল যমুনা নদী ছুঁয়ে আছে।
হঠাৎ আমার মনে হলো এ জায়গার খোঁজই এতদিন ধরে করে বেড়াচ্ছি। তারপর আমি পাশের ঘরে গেলাম গর্গমুনির কাছে আমার ২৫ সেন্ট দিয়ে আসতে। টাকা নেওয়ার সময় গর্গমুনি আমার কাছে এক সেট ভাগবত বিক্রয় করলেন। তখনকার সময় একসেট ভাগবতে মাত্র তিনটি বই ছিল। যখন তিনি দেখলেন যে আমি আমার কাছে থাকা সব টাকা তাকে দিয়ে দিচ্ছি, তখন তিনি আমাকে পিছনে থাকা জয়ানন্দের দিকে তাকাতে বললেন। জয়ানন্দ প্রথমেই আমাকে যে কথা বললেন তা হল, “তুমি কি পেরেক গাঁথতে পার?” আমি বললাম, “অবশ্যই”। তারপর তিনি আমাকে একটা পেরেক দিয়ে বললেন, “দেখাও তো গেঁথে”। আমি পেরেকটা নিলাম আর দেয়ালে গাঁথলাম হাতুড়ি দিয়ে। তিনি তাই দেখে বললেন, “বেশ ভালো”। এরপর তিনি আমাকে একটা রথের ছবি দেখালেন। তিনি বললেন আমরা এরকম একটি রথ তৈরি করতে চাই। তখন আমি বললাম সামনের বছর নাকি ? তিনি বললেন,“না না দুই সপ্তাহের মধ্যে। এটা খুবই জরুরী। তুমি কি আমাদের সাহায্য করতে পারবে ?”
তখন থেকে প্রতিদিন আমি তাকে কাজে সাহায্য করতে যেতাম। তিনি আমাকে প্রভুপাদের কথা বলতেন। তিনি বলতেন প্রভুপাদ হচ্ছেন একজন মহৎ সন্ন্যাসী যিনি পাশ্চাত্যে হরিনাম সংকীর্তন এনেছেন। তারপর আমি তার অনুমতি নিয়ে একদিন জপ করতে গেলাম। নন্দকুমার আমাকে একসেট জপমালা দিয়েছিল। আমি পূর্বে যোগ অভ্যাস করতাম, তাই সেই জপমালা নিয়ে আমি অর্ধ-পদ্মাসনে বসে জপ করতে লাগলাম। আমার এর আগে এরকম অভিজ্ঞতা কখনো হয়নি। আমার রোমাবলী দাঁড়িয়ে গিয়েছিল, মাঝে মাঝে চোখ দিয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়ছিল। প্রথমদিন আমি কয়েক ঘণ্টা ধরে ৩২মালা জপ করেছিলাম। সেই অভিজ্ঞতা ছিল অনন্য। আমি যখন ফিরে যাই তখন নন্দকুমার উদগ্রীব হয়ে বলে, “তোমার কাছে কি জপমালাটা আছে ? ওটা প্রভুপাদের জপমালা। এটা ভুল করে তোমাকে দিয়েছিলাম- আমি বললাম, “হ্যাঁ, ওটা আমার কাছে আছে।” নন্দকুমার তখন ওই জপমালাটা ফেরত দিয়ে অন্য একটি জপমালা দিয়েছিল।
আমি এরপর ভাবলাম যদি আমাকে চেষ্টা করতে হয় তাহলে আমি পুরোপুরি চেষ্টা করব। আর এটা যদি সত্য না হয়, আমি অন্তত বলতে পারব যে আমি চেষ্টা করেছিলাম। আর যদি এটি সত্য হয় তাহলে আমি অবশ্যই এটি লাভ করব। তাই রথযাত্রার দিন আমি সিদ্ধান্ত নিলাম যে আমি মস্তক মুণ্ডণ করব। জয়ানন্দ প্রভু কৃপা করে আমাকে মুণ্ডণ করে দিলেন। আমার অনেক বড় শিখা ছিল। রথযাত্রার সময় আমি মুণ্ডিত মস্তকে প্রথাগত থান কাপড় পরিধান করলাম তখনকার সময় এত কড়াকড়ি ছিল না। ছয় মাস ধরে মন্দিরে যাতায়াত করা কয়েকজন দেখল কিভাবে মাত্র দুই সপ্তাহে আমি মস্তক মুণ্ডণ করে রথ টানছি। তখন তারা বলতে লাগলো যদি সে এটা করতে পারে তাহলে আমরা কেন পারবো না ? মধুদ্বিষ এবং আরো অনেকে এরপর মন্দিরে যোগ দেয়। এভাবেই আমি নিজেকে হরেকৃষ্ণ আন্দোলনের সাথে সম্পৃক্ত করি।

মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন